আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি মানুষকে অগ্রগতির পথে নিয়ে গেলেও তাকে যান্ত্রিক করে তুলেছে আর তার ভুক্তভোগী আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের শিশুরা। কথায় আছে কাউকে কিছু উপদেশ দিয়ে শেখানোর থেকে উদাহরণ দিয়ে শেখানো সহজতর। আর এই ক্ষেত্রে ছোটদের জন্য রচিত নীতিমূলক গল্পের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
গল্প পড়া ও গল্প শোনার মধ্য দিয়ে ছোটরা বিনোদনের সাথে সাথে নৈতিক মূল্যবোধগুলো হৃদয়ঙ্গম করে নেয়। তাই শিশু মনে প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ জাগানোর সবথেকে সহজ উপায় এই গল্পের মাধ্যম; যা ভবিষ্যতে তাদের দৃঢ ব্যক্তিত্ব, সৎ এবং প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
নীতিকথা কাকে বলে?
মানব সমাজে বিভিন্ন সামাজিক ও পারিবারিক নীতিগুলির মাধ্যমে যে লোক কাহিনি বর্ণিত করা হয় তাকেই বলা হয় নীতি কথা।
৫ টি ছোটদের শিক্ষামূলক ছোট গল্প | 5 Bengali Moral Stories.
এই পোস্টে আমরা এরকমই কিছু সেরা ছোট শিক্ষনীয় মজার গল্প শেয়ার করলাম যা বাচ্চাদের খুব ভালো লাগবে এবং ওদের জন্যে শিক্ষণীয় হবে।
১) লোভী কুকুর :
একদিন একটি লোভী কুকুর একটি কসাই – এর দোকান থেকে এক টুকরো মাংস চুরি করল। তা দেখে কসাই তাঁর পিছনে তাড়া করল কিন্তু কিছুদূর পর্যন্ত গিয়ে সে তার নিজের দোকানে ফিরে এল। এদিকে কুকুরটা ভীষণ ভয়ে ছুটতে লাগল প্রাণপণে।
অনেকটা যাওয়ার পর সে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল যে কসাইটা তার দিকে তাড়া করে আসছে কিনা। কাউকে আসতে না দেখে সে তার গতি কমিয়ে ধীরে সুস্থে হাঁটতে লাগল।কিছুক্ষণ পরে সে এসে পৌঁছল একটা ছোট্ট নদীর কাছে।
সে তখন মুখের মাংসের টুকরোটা নিয়ে সেতুর ওপর দিয়ে নদী পার হতে লাগল ।সেসময় নদীর পরিষ্কার জলে তার প্রতিবিম্ব ভেসে উঠতে সে সেদিকে তাকিয়ে দেখল। লোভী আর বোকা কুকুরটা নিজের প্রতিবিম্বকে মাংস মুখে অন্য একটি কুকুর মনে করল।সেই মাংসের টুকরোটাও পাওয়ার জন্য তার খুব লোভ হলো।
সে এবার অন্য কিছু চিন্তা ভাবনা না করে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল আর সঙ্গে সঙ্গে জলের স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।লোভী কুকুরটা মাংসের টুকরোটার সাথে সাথে তার মূল্যবান প্রাণ টা ও হারাল।
নীতিকথা :"অতিরিক্ত লোভ মানুষের সর্বনাশের কারণ”
২) বুদ্ধিমান কাক :
একটা কাক উড়তে উড়তে এমন একটা স্থানে এসে পৌঁছালো যেখানে জল পাওয়া খুবই দুষ্কর।অথচ পিপাসায় তার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর কাক একটা কলসি পেল।
কিন্তু কলসির কাছে গিয়ে সে হতাশ হলো শুধু ঠোঁট বাড়িয়ে চেষ্টা করল অনেকবার জল পান করার।কিন্তু জলের নাগাল না পেয়ে কাকটি চিন্তা করতে লাগল কী করা যায়! কলসির আশেপাশে কিছু নুড়িপাথর পড়েছিল ;সেগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ কাকের মাথায় একটি বুদ্ধি এল।
একটি একটি করে নুড়িপাথর নিয়ে কলসির মধ্যে ফেলতে লাগল সে ।পাথর জায়গা দখল করায় জল উঠে এল কলসির মুখের কাছে। তৃষ্ণার্ত কাকের প্রাণ খুশিতে ভরে উঠল।ঠোঁট ডুবিয়ে ডুবিয়ে প্রাণ ভরে জল পান করে সে তার তৃষ্ণা মেটাল।
নীতিকথা : “বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়”।
৩) শিয়াল ও আঙুর ফল:
তিন দিন ধরে অনবরত বৃষ্টি হওয়ার কারণে একটি শিয়াল খাবারের খোঁজে কোথাও বেরোতে পারেনি। খিদের জ্বালায় থাকতে না পেরে শিয়ালটি বনের মধ্যে খাবারের সন্ধানে ঘুরতে লাগল ।
হঠাৎ একটি ঝোপের দিকে তার নজর পড়ল।সে দেখল ঝোপের পাশে একটি আঙুরগাছ এবং অনেক পাকা আঙুরের থোকা ঝুলছে সেখানে। খিদের জ্বালায় সেই আঙুর খেয়েই পেট ভরাবে বলে শেয়ালটি মনস্থির করল।
কিন্তু গাছের এত উপরে থাকা আঙুরের থোকা গুলির সে কীভাবে নাগাল পাবে সেই নিয়ে ভাবতে শুরু করল । কিন্তু শিয়ালটি তার কোনও উপায়ই বার করতে পারল না। অবশেষে বিফল মনোরথ হয়ে সে সেই স্থান পরিত্যাগ করল ।
ফেরার পথে সে বলতে লাগল - “আঙুর ফল টক; ওই আঙুর আমি খেতেও পারতাম না আর খেলেও আমার পেট ভরত না”।
নীতিকথা : নিজের অযোগ্যতা ঢাকার জন্য পরনিন্দা করা অনুচিত।
৪) রাখাল ছেলে আর নেকড়ে :
এক গ্রামে একটি রাখাল ছেলে বাস করত। তার বাবা তাকে ভেড়াদের যত্ন নিতে আদেশ দিয়েছিল। প্রতিদিন ছেলেটিকে ঘাসের মাঠে ভেড়া দের ছড়াতে নিয়ে যেতে হতো।রাখাল ছেলেটির এই কাজ একদম পছন্দ ছিল না কারণ সে দৌড়তে আর খেলতে চাইত। তাই একদিন সে গ্রামের লোকের সাথে মজা করার সিদ্ধান্ত নিল।
হঠাৎ সে চিৎকার করে বলল “নেকড়ে ,নেকড়ে!” রাখাল ছেলেটির চিৎকার শুনে পুরো গ্রামের লোক নেকড়েকে তাড়ানোর জন্য পাথর, শাবল, লাঠি যে যা পারল নিয়ে এল। কিন্তু বনে এসে গ্রামবাসীরা যখন দেখল যে কোনও নেকড়ে নেই ,রাখাল বালকটি তাদের সময় নষ্ট করেছে এবং তাদের ভয় দেখাবার জন্যই মিথ্যা কথা বলছে তখন তারা বিরক্ত বোধ করল এবং যে যার বাড়িতে ফিরে গেল
পরের দিন ছেলেটি আবার চিৎকার করে বলল ,”নেকড়ে নেকড়ে”! আর গ্রামবাসীরা আবারও নেকড়ে তাড়াতে রাখাল ছেলেটির কাছে দৌড়ে এল ।ছেলেটি তাদের ভয় দেখে যখন হেসে উঠল গ্রামবাসীরা চলে গেল এবং কেউ কেউ খুব রাগান্বিত হল রাখাল ছেলেটির কীর্তিকলাপ দেখে।
তৃতীয় দিন ছেলেটি ভেড়া চড়াবার জন্য ছোট্ট একটি পাহাড়ে উঠেছিল আর হঠাৎ সে দেখল সত্যিকারের একটা নেকড়ে বাঘ তার ভেড়াদের ওপর আক্রমণ করেছে। সে প্রাণপণ চিৎকার করে বলল “নেকড়ে ,নেকড়ে!!”
কিন্তু গ্রামবাসীরা ভাবল রাখাল ছেলেটি বুঝি তাদের আবার বোকা বানানোর চেষ্টা করছে তাই এবার কেউ ছেলেটিকে উদ্ধার করতে এল না। মিথ্যে বলার কারণে রাখাল ছেলেটি তার তিনটি ভেড়াকে হারাল।
নীতিকথা : “মিথ্যে গল্প বানানো কখনো উচিত না কারণ আসল প্রয়োজনে কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে না”।
৫) বুদ্ধি খাটিয়ে গণনা :
একবার আকবর তার আদালতে একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন যা সবাই কে অবাক করেছিল । রাজসভার সবাই যখন উত্তর বের করার চেষ্টা করছিল তখন বীরবল এগিয়ে গিয়ে জানতে চিইলেন কি ব্যাপার। আর তাই তারা বিরবলকে প্রশ্নটি করে জানতে চাইল
“শহরে কতগুলো কাক আছে?’
বীরবল সাথে সাথেই হাস্য বদনে আকবরের কাছে গিয়ে ঘোষণা করলেন যে তাঁর প্রশ্নের উত্তর হল, একুশ হাজার পাঁচশো তেইশটি কাক গোটা শহরে উপস্থিত। যখন সম্রাট জানতে চাইলেন যে বীরবল কিভাবে উত্তরটি দিতে পারলেন, তখন বীরবল উত্তরে বলেছিলেন , ‘ মহারাজ ,আপনার লোকেদের কাকেদের সংখ্যা গণনা করতে বলুন।
যদি আরো কাক থাকে, তাহলে শহরের বাইরে থেকে কাকেদের আত্মীয়রা তাদের দেখা করতে এসেছে অর যদি কম থাকে, তাহলে কাকেরা শহরের বাইরে তাদের আত্মীয়–স্বজনের সাথে দেখা করতে গেছে। ‘ উত্তর পেয়ে খুশী হয়ে, আকবর বীরবলকে পুরস্কৃত করেছিলেন ।
নীতিকথা: “প্রত্যেক উত্তরের ইএকটি সঠিক ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন”।
উপসংহার:
নীতিমূলক এই গল্পগুলি ছোটদের একটি গুণমানযুক্ত সময় কাটানোর সহায়ক। ভালোভাবে সময় কাটানো ও বিনোদনের সাথে সাথে নীতি সমৃদ্ধ এই ছোট গল্পগুলি তাদের মানসিক বিকাশ ও সুশিক্ষা ও প্রদান করবে।





.jpg)
No comments:
Post a Comment