সাহসী ছেলের গল্প
নাম ছিল অর্ণব। ছোট্ট একটি গ্রামে তার জন্ম। গ্রামের নাম ছিল বেলুনিয়া। দূরে, শহরের দিকে তাকিয়ে সে প্রতিদিন স্বপ্ন দেখত। বাবা-মা কৃষক, নিজেদের জমিতে ফসল ফলানোই তাদের একমাত্র জীবিকা। অর্ণব ছোটবেলা থেকেই অনেক বড় স্বপ্ন দেখত। অন্য সবার থেকে কিছুটা আলাদা ছিল তার মনোভাব। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল সে। স্কুলে শিক্ষকরা সব সময় তার প্রশংসা করতেন।
একদিন স্কুলের শিক্ষক বললেন, "তোমার মতো মেধাবী ছেলে এত ছোট জায়গায় থেকে অনেক দূর যেতে পারবে না। শহরে যাও, সেখানে আরও ভালো পড়াশোনা করতে পারবে।" সেই সময় থেকেই অর্ণবের মাথায় শহরের চিন্তা আসে। তবে বাবা-মা এত সহজে ছেলেকে ছেড়ে দিতে চায়নি। গ্রামের সাথে তাদের এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল।
শেষমেশ অনেক বুঝিয়ে অর্ণবের বাবা-মা তাকে শহরে পাঠানোর জন্য রাজি হন। একটি বড় শহরে নামি স্কুলে ভর্তি হল সে। শহরের জগতটা একদম আলাদা। ব্যস্ত রাস্তা, লোকজনের ভিড়, আর আধুনিকতার ছোঁয়া। অর্ণব প্রথম দিকে খুবই অসুবিধার মধ্যে পড়ল, গ্রামের মাটির গন্ধ, পাখির ডাক, আর সেই সবুজ মাঠ যেন কোথায় হারিয়ে গেল। শহরের কোলাহল, দৌড়ঝাঁপে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো লাগছিল।
কিন্তু অর্ণবের ভেতরে ছিল এক অসম্ভব জেদ। সে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য সমস্ত শক্তি দিয়ে পড়াশোনায় মন দিল। শিক্ষকরা তার মেধা দেখে মুগ্ধ। শহরের সবাই তাকে চেনে, একদিন তার নাম হবে, এমনই স্বপ্ন দেখত সে।
অর্ণবের স্কুল শেষ হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হল সে। সময়ের সাথে সাথে অর্ণবের সাথে তার গ্রামের দূরত্ব আরও বাড়তে থাকল। প্রথমে সে প্রতি মাসে একবার বাড়ি আসত, পরে তা দুই মাসে, তিন মাসে পরিণত হল। মা ফোনে তাকে বলত, "কবে আসবি রে? তোকে না দেখে থাকতে পারি না।" কিন্তু অর্ণব প্রতিবারই কোনো না কোনো কাজের অজুহাত দেখিয়ে বলত, "এই তো মা, খুব শীঘ্রই আসব।"
মনে মনে অর্ণব বুঝতে পারছিল, শহরের চাকচিক্য আর তার নিজের উচ্চাশা তাকে গ্রামের মাটির থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পর চাকরিতে ঢুকল অর্ণব। নামকরা একটি কোম্পানিতে উচ্চপদে কাজ। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত জীবন। নিজের জায়গা করে নিতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছিল তাকে। মা ফোনে বলত, "খুব পরিশ্রম করছিস রে, শরীর খারাপ করিস না।" অর্ণবও মায়ের চিন্তা দূর করতে বলত, "না মা, সব ঠিক আছে।"
কিন্তু এই ঠিক থাকা মানে ছিল ভেতরে ভেতরে অর্ণবের জীবন থেকে মায়ের জন্য সময় ক্রমেই কমে যাওয়া। বন্ধুরা মাঝে মাঝে মজা করে বলত, "তুই গ্রামের ছেলে, এত বড় শহরের মানুষ হয়ে গেলি কী করে?" অর্ণব হাসত, কিন্তু মনে মনে একটা অপরাধবোধও জন্ম নিত।
বছরের পর বছর কেটে গেল। অর্ণব এখন অনেক বড় হয়েছে, অনেক অর্থ, সম্মান, সবকিছু পেয়েছে সে। কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে একা বসে, গ্রাম আর মায়ের কথা মনে পড়ে তার। সেই ছোট্ট কুঁড়েঘর, মাটির রাস্তা, নদীর পাড়ে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়।
মাঝে মাঝে মা ফোন করে খুবই চিন্তিত স্বরে বলত, "তোর বাবার শরীর খুব খারাপ। একটু আসবি কি?" অর্ণবের কাজের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে সে বারবার সময় বের করতে পারত না। এইভাবে দিনের পর দিন চলতে লাগল।
একদিন হঠাৎ ফোন এল, বাবার শরীর আরও খারাপ। এবার আর দেরি করার সুযোগ ছিল না। অর্ণব তাড়াতাড়ি গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গাড়িতে বসে পুরো রাস্তা জুড়ে শুধু ভাবছিল, এতদিন পর বাড়ি যাচ্ছে সে। বাবা-মায়ের মুখটা চোখের সামনে ভাসছিল।
বাড়ি পৌঁছানোর পর মা-বাবার মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখল অর্ণব। এতদিন পর ছেলেকে পেয়ে তারা যেন নতুন জীবন ফিরে পেল। বাবার শরীর কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছে, তবে এখনও দুর্বল। মা সারাদিন ছেলের যত্ন করতে ব্যস্ত, যেন সবকিছু নতুন করে ফিরে পেয়েছেন।
অর্ণব এই কয়েকটা দিন গ্রামের মাটিতে কাটিয়ে বুঝতে পারল, এতদিনের শহরের জীবন আর উচ্চাশা তাকে যা দিতে পারেনি, সেই শান্তি সে এই ছোট্ট গ্রামেই পেয়েছে।
কিন্তু আবারও শহরে ফিরে যেতে হবে। তার কাজের জন্য, তার ভবিষ্যতের জন্য। বিদায়ের সময় মা আবারও কাঁদতে কাঁদতে বলল, "ফিরে আসিস রে, আর দেরি করিস না।" অর্ণব প্রতিবারের মতোই বলল, "এই তো মা, খুব তাড়াতাড়ি আসব।"
শহরে ফিরে আসার পর অর্ণবের জীবনে আবারও ব্যস্ততা শুরু হল। মায়ের সেই কথা, বাবার দুর্বল চেহারা, সবকিছুই মাঝে মাঝে মনে পড়ত, কিন্তু কাজের চাপে সে সব ভুলে যেত।
কিন্তু একদিন ফোন এল। মা ফোনে খুবই ভাঙা স্বরে বলল, "তোর বাবা আর নেই রে..." অর্ণব সব কাজ ফেলে ছুটে গেল বাড়ির দিকে। এইবার আর কোনো দেরি করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু ততদিনে অনেক কিছুই বদলে গেছে।
বাবার মৃত্যু আর মায়ের একাকীত্ব তাকে চিরকালীন এক উপলব্ধির মধ্যে ফেলে দিল। এতদিনের শহরের জীবনের প্রতি তার যে আকর্ষণ ছিল, তা যেন মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল।
অর্ণব বুঝতে পারল, জীবনের সবকিছু পাওয়ার চেষ্টায় আমরা কখনও কখনও যা সবচেয়ে মূল্যবান, তা হারিয়ে ফেলি।
সব শেষে: "দূরান্ত ছেলের গল্প" শুধুমাত্র একটি ছেলের গল্প নয়, এটি আমাদের সকলের জীবনের গল্প। আমরা সকলেই জীবনে উন্নতির জন্য দূরত্ব তৈরি করি, কিন্তু সেই দূরত্বই আমাদের কাছের মানুষদের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

No comments:
Post a Comment