Friday, 11 April 2025

"সমুদ্রের মাঝখানে এক জাহাজ প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয়ঙ্কর গল্প " (A terrifying story of a ship caught in a violent storm in the middle of the ocean)

 


শিরোনাম: “ঝড়ের রাতে ফিরে দেখা”

সমুদ্রটা ছিল শান্ত, সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। “এম.ভি. পূরবী” নামে একটি মালবাহী জাহাজ ভারত থেকে সিঙ্গাপুরের দিকে রওনা হয়েছিল তিনদিন আগে। জাহাজটিতে ছিল বিশ জন নাবিক ও ক্যাপ্টেন রাজীব সেন। অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন রাজীব প্রায় বিশ বছর ধরে এই সমুদ্রপথে যাতায়াত করছেন। তিনি জানতেন কেমন করে ঝড় মোকাবিলা করতে হয়, কিন্তু এবারের ঝড় ছিল অপ্রত্যাশিত এবং ভয়ঙ্কর।


তৃতীয় দিনের রাত। হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল, বাতাস বইতে লাগল অস্বাভাবিক গতিতে। ক্যাপ্টেন রাজীব তার রাডার স্ক্রিনে দেখলেন এক বিশাল ঘূর্ণিঝড় তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে সতর্ক করলেন। ইঞ্জিন কক্ষে থাকা প্রধান ইঞ্জিনিয়ার সুব্রতবাবুকে জানালেন যেন ইঞ্জিন পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে এবং তৎক্ষণাৎ গতিপথ পরিবর্তনের জন্য নির্দেশ দিলেন।



কিন্তু সময় আর ছিল না। রাত আটটার দিকে ঝড় পুরো শক্তিতে আঘাত হানল। বিশাল বিশাল ঢেউ এসে জাহাজটিকে দোলাতে লাগল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বজ্রপাত কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। এমন এক অন্ধকার ঘূর্ণিপাকে পড়েছে যেন সব আলো নিভে গেছে।


জাহাজের ডেকে তখন হাহাকার। কিছু মালামাল পানিতে পড়ে গেল। কিছু নাবিক জলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। ক্যাপ্টেন রাজীব চিৎকার করে সবাইকে নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিলেন। জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট পরে সবাই নিজেদের গেঁথে রাখলেন জাহাজের বিভিন্ন অংশে।

একটা সময় এসে ঢেউয়ের তীব্রতায় জাহাজের সামনে দিকটা ফেটে যায়। পানি ঢুকতে থাকে ভিতরে। ইঞ্জিন রুম ডুবে যেতে থাকে। ক্যাপ্টেন বুঝতে পারেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যে জাহাজটা ডুবে যাবে।


তিনি সবাইকে লাইফবোটে ওঠার নির্দেশ দিলেন। এই মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।

সুব্রতবাবু আর ক্যাপ্টেন রাজীব সবাইকে এক এক করে লাইফবোটে তুলে দিলেন। তখন একটা বিশাল ঢেউ এসে ধাক্কা দিল জাহাজে। ক্যাপ্টেন রাজীব নিজেই ছিটকে গিয়ে পড়লেন ডেকে, মাথায় আঘাত লাগল।


সুব্রতবাবু ছুটে এলেন তাঁকে তুলতে, কিন্তু রাজীব তাঁকে ঠেলে বললেন—
“সবার জীবন আগে, তুমি যাও! আমি আসছি!”

সুব্রতবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “স্যার, আমি আপনাকে রেখে যাব না!”
রাজীব জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন— “যাও সুব্রত, এটা আদেশ!”

শেষে বাধ্য হয়ে সুব্রতবাবু লাইফবোটে উঠলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজের একাংশ পানির নিচে তলিয়ে গেল। ক্যাপ্টেন রাজীব ছিলেন সেই অংশেই।

সকালের আলো ফুটল। ঝড় থেমে গেছে, কিন্তু চারদিকে কেবল সমুদ্র। বাঁচা-মরার মাঝখান থেকে লাইফবোটে থাকা জনা পনেরো লোক কোনও মতে প্রাণে বেঁচে গেছে। তারা চোখ মেলে খুঁজতে লাগল ক্যাপ্টেনকে।

তিন দিন ভেসে ছিল লাইফবোট। সবার মুখে তখন শুধু একটাই কথা—
“ক্যাপ্টেনকে আমরা হারালাম?”

চতুর্থ দিনে তাদের উদ্ধার করল একটি তেলবাহী জাহাজ। বাঁচা প্রাণদের ফিরে আনা হল মাটির পৃথিবীতে। সংবাদে এল এই গল্প। “এম.ভি. পূরবী”-র একঝাঁক সাহসী নাবিক আর তাদের নেতৃত্বদানকারী এক মহৎ ক্যাপ্টেনের গল্প।

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়।

দুই সপ্তাহ পরে, আন্দামানের কাছে একটি মাছ ধরার নৌকা এক আশ্চর্য জিনিস খুঁজে পেল। এক বৃদ্ধ, রক্তাক্ত, অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছেন একটি কাঠের ভাঙা দরজার উপর। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হল।


চোখ খুললেন ক্যাপ্টেন রাজীব।

তিনি বেঁচে ছিলেন! শেষ মুহূর্তে জাহাজের ভাঙা একটি দরজা আঁকড়ে ধরে তিনি সমুদ্রের মধ্যে ভেসে থেকেছিলেন। সময়-জ্ঞান হারিয়ে ফেললেও প্রাণশক্তি হারাননি।

এই গল্প আজও বলে মানুষ— ঝড় যতই হোক, নেতৃত্ব আর সাহস যদি অটুট থাকে, তবেই বেঁচে থাকার গল্প লেখা যায়।

 

See More


No comments:

Post a Comment

"সমুদ্রের মাঝখানে এক জাহাজ প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয়ঙ্কর গল্প " (A terrifying story of a ship caught in a violent storm in the middle of the ocean)

  শিরোনাম: “ঝড়ের রাতে ফিরে দেখা” সমুদ্রটা ছিল শান্ত, সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। “এম.ভি. পূরবী” নামে একটি মালবাহী জাহাজ ভারত থেকে সিঙ্গ...