Sunday, 1 September 2024

বর্ষার রাতে একা হাঁটা স্মৃতি

 


বর্ষার রাতে একা হাঁটা


প্রথম অংশ: অন্ধকার শুরু

স্কুল ছুটি হয়েছে, কিন্তু আজকের দিনটা ছিল অন্যরকম। আকাশ মেঘে ঢেকে গেছে, বাতাসে একটা অদ্ভুত শীতলতা। অণিকা ক্লাস থেকে বেরিয়ে বাইরে আসতেই টের পেল, ঝড় আসছে। বাড়ি ফিরতে হবে, কিন্তু মেইন রোডটা অনেক লম্বা। শর্টকাট ধরে গেলেই তাড়াতাড়ি পৌঁছানো যাবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে অণিকা পা বাড়ায় সেই সরু রাস্তাটার দিকে যেটা একটা ছোটো বনের ভেতর দিয়ে গেছে।

বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। প্রথমে সামান্য, তারপর ধীরে ধীরে ভারি হতে লাগল। অণিকা হাতের ছাতাটা খুলল, কিন্তু বাতাস এত জোরে বইছিল যে ছাতাটা ধরে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ল। রাস্তা ফাঁকা, কেউ নেই। সবারই হয়তো আগে থেকেই বোঝা উচিত ছিল, এমন এক ঝড় আসছে যে এক মুহূর্তও দেরি করলে বড় বিপদ হতে পারে।


দ্বিতীয় অংশ: অদ্ভুত পদশব্দ

রাস্তার অন্ধকার আরও গভীর হয়ে উঠছে। বৃষ্টির শব্দে সব কিছু ঢেকে গেছে, কিন্তু হঠাৎই অণিকা টের পায়, তার পিছনে কিছু একটা চলছে। সে থামল, কিন্তু পায়ের শব্দটা তখনও শোনা যাচ্ছে। ভয় তাকে গ্রাস করতে শুরু করল। বনের ভিতর দিয়ে আসার সময়ই সে শুনেছিল, এই রাস্তায় অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। কিন্তু এগুলো সবই ছিল গল্প, এমনটাই সে ভেবেছিল।

সে আবার হাঁটা শুরু করল, কিন্তু এবার আরও দ্রুত। পিছনের পদশব্দও দ্রুত হতে লাগল। অণিকার মনের ভেতর ভয় জমতে লাগল। বৃষ্টির সাথে সেই অদ্ভুত শব্দ যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠছিল। সে রাস্তা থেকে একটু সরে গিয়ে বড় একটা গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়ল।


তৃতীয় অংশ: মুখোমুখি

পদশব্দ থেমে গেল। অণিকা ভয় পেয়ে মাথা বের করে দেখল। একটা ছায়ামূর্তি তার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। অণিকার মনে হল, এটা যেন তার চেনা কেউ। কিন্তু এই অন্ধকারে ঠিক চিনতে পারা যাচ্ছে না। মূর্তিটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। অণিকা পিছনে সরে যেতে যেতে একটা পাথরের উপর হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।

ছায়ামূর্তিটা সামনে এসে দাঁড়াল। অণিকা হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কে এই ব্যক্তি? এই সময়ে এখানে কি করছে? হঠাৎ, এক ঝলক বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে অণিকা দেখতে পেল, লোকটার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি। যেন সে অনেক কিছু জানে, যা অণিকা জানে না।

লোকটা সামনে এসে বলল, “তোমারই জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”


চতুর্থ অংশ: আতঙ্কের মুহূর্ত

অণিকা বুঝতে পারছিল না কি করবে। ছায়ামূর্তিটা তার দিকে এগিয়ে আসতেই তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত চলতে লাগল। “তুমি কে?” অণিকা কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

“তুমি আমাকে চিনতে পারছ না, তাই না? আমি তোমার স্কুলের পুরনো চেনা বন্ধু।” লোকটা বলল, আর তার চোখে এক ধরণের ক্রূরতা দেখা গেল।

অণিকা তাকে চিনতে পারল না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল যে সে কোনো ভুল করছে। লোকটা এগিয়ে এসে অণিকার হাতটা ধরে টান দিল। অণিকা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু লোকটার শক্তি অনেক বেশি ছিল।


পঞ্চম অংশ: ছুটে পালানো

এক মুহূর্তের মধ্যে, অণিকা বুঝল যে তাকে পালাতে হবে। সে লোকটার হাতে কামড় দিয়ে দৌড়ে পালাতে শুরু করল। লোকটা একটা চিৎকার দিল, কিন্তু অণিকা পিছনে না তাকিয়ে দৌড়াতে লাগল। বৃষ্টিতে পথ আরও পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে, কিন্তু অণিকা থামল না। সে জানে, থামলে তাকে আর বাঁচানো যাবে না।


ষষ্ঠ অংশ: একটি পুরোনো বাড়ি

দৌড়াতে দৌড়াতে অণিকা বনের একদম গভীরে এসে পড়ল। এখানে একটা পুরোনো, ভাঙাচোরা বাড়ি ছিল, যা অনেক দিন ধরে পরিত্যক্ত ছিল। অণিকা কোনও উপায় না দেখে বাড়িটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। ভেতরে ঢুকেই সে দরজাটা বন্ধ করে দিল, কিন্তু তার মনে হল লোকটা তার পিছনে আসছে।

বাড়িটার ভেতর অন্ধকার, মেঝে থেকে ছাদের পর্যন্ত সব জায়গায় ধুলো জমে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, কিন্তু বাইরে থেকে লোকটার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। অণিকা নিজের নিঃশ্বাস ধরে রেখে অপেক্ষা করতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, যেন তার হৃদস্পন্দন পুরো বাড়িটা শোনা যাচ্ছে।


সপ্তম অংশ: এক অজানা রহস্য

হঠাৎ, অণিকার চোখে একটা পুরোনো বাক্স পড়ল, যা একটা কোণে পড়ে ছিল। বৃষ্টি আর বজ্রপাতের মধ্যে, সেই বাক্সটা যেন আলাদা করে চমকাচ্ছিল। অণিকা কৌতূহল নিয়ে বাক্সটার দিকে এগিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বাক্সটা খুলল, আর তার ভেতর যা দেখল, তা দেখে সে হতভম্ব হয়ে গেল।

বাক্সটার ভেতরে ছিল পুরোনো কাগজ, কিছু পাথরের টুকরো, আর একটা ছুরি। কাগজগুলোতে অনেক পুরোনো একটা ভাষায় কিছু লেখা ছিল, যা অণিকা বুঝতে পারল না। কিন্তু ছুরিটা দেখেই তার মনে ভয় ঢুকে গেল। এতদিনের পুরোনো গল্পগুলো তার মনে ফিরে আসতে লাগল। এই ছুরির সাথে নিশ্চয়ই কোনো গা ছমছমে ইতিহাস জড়িত ছিল।


অষ্টম অংশ: ধাওয়া এবং মুক্তি

ঠিক তখনই, দরজায় একটা ধাক্কার শব্দ হল। লোকটা হয়তো বুঝতে পেরেছে যে অণিকা এই বাড়িতেই লুকিয়ে আছে। অণিকা দ্রুত ছুরিটা হাতে নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে গেল। দরজাটা খোলার সাথে সাথে সে ছুরিটা লোকটার দিকে ছুঁড়ে মারল।

লোকটা চমকে উঠল, আর সেই সুযোগে অণিকা জানালার বাইরে লাফিয়ে বেরিয়ে এল। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু অণিকা এবার নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছুটতে লাগল। পিছনে তাকানোর সাহস করল না, আর একটানা দৌড়াতে দৌড়াতে সে অবশেষে মেইন রোডে এসে পৌঁছাল।


নবম অংশ: সত্যের উদঘাটন

মেইন রোডে আসতেই অণিকা দেখতে পেল একটা পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। সে দৌড়ে গিয়ে পুলিশদের সব কিছু বলল। পুলিশরা অণিকাকে নিয়ে বনের দিকে ফিরে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেল, সেই ছায়ামূর্তি লোকটা রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। তার হাতে সেই ছুরির দাগ, যা অণিকা ছুঁড়ে মেরেছিল।

পুলিশরা তাকে ধরে নিয়ে গেল, আর অণিকা বাড়ি ফিরে এলো। বাড়িতে সবাই তার জন্য খুব চিন্তিত ছিল, কিন্তু যখন তারা শুনল কি ঘটেছে, তারা সবাই আতঙ্কিত হয়ে গেল।


দশম অংশ: আতঙ্কের শেষে

কিছুদিন পর পুলিশরা তদন্ত করে জানতে পারল, লোকটা একজন অপরাধী, যে অনেক দিন ধরেই বনের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। সে বহুদিন ধরে এই এলাকার মানুষকে ভয় দেখিয়ে আসছিল। কিন্তু অণিকার সাহসিকতা তাকে পরাজিত করেছে।

অণিকা ধীরে ধীরে সেই ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি ভুলে যেতে শুরু করল। কিন্তু তার মনে সবসময়ই একটা প্রশ্ন থেকে গেল—সেই বাক্সটা কি ছিল? আর সেই কাগজগুলোতে কি লেখা ছিল?

শেষমেশ, যদিও রহস্যটা পুরোপুরি সমাধান হয়নি, অণিকা জানে যে সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে। আর হয়তো সেই বাক্সটা এখনো তার ভবিষ্যতে কোনো দিন ফিরে আসতে পারে।

সমাপ্তি:

এই গল্পটা আপনাকে একটা রহস্যময় ও ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ে গেল। এটি অণিকার সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার গল্প, যা তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। গল্পের শেষে কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়, যা গল্পটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।



No comments:

Post a Comment

"সমুদ্রের মাঝখানে এক জাহাজ প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে পড়ে যাওয়ার ভয়ঙ্কর গল্প " (A terrifying story of a ship caught in a violent storm in the middle of the ocean)

  শিরোনাম: “ঝড়ের রাতে ফিরে দেখা” সমুদ্রটা ছিল শান্ত, সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে। “এম.ভি. পূরবী” নামে একটি মালবাহী জাহাজ ভারত থেকে সিঙ্গ...